ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপিপন্থি ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ড্যাব) চিকিৎসকদের মাঝে অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব দিন দিন ঘনীভূত হচ্ছে। এ নিয়ে বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়েছেন চিকিৎসকসমাজ।
স্থানীয় বিএনপিপন্থি চিকিৎসকরা জানান, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের ১৫ বছরের আমলে ড্যাবপন্থি চিকিৎসকরা নানা ধরনের নির্যাতন তথা বদলির শিকার হয়ে নীরবে তাদের পেশাগত দায়িত্ব পালন করেছেন। ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজের ড্যাবের নেতৃবৃন্দ সবার সঙ্গে তালমিলিয়ে নীরবে তাদের কাজ করে গেছেন। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর এখন সময় এসেছে সংগঠনকে গুছিয়ে শক্তিশালী করা। কিন্তু ময়মনসিংহ মেডিক্যালের চিত্র দিন দিন পাল্টাতে শুরু করেছে। যারা বিগত ১৫ বছর বাইরে ছিলেন তারা এখন ময়মনসিংহে এসেই আধিপত্য বিস্তারের নামে সংগঠনকে গ্রুপিংয়ের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। এর ফলে নিজেদের মধ্যে দ্বন্দ্ব দিন দিন বেড়েই চলেছে।
তারা আরও জানান, মেডিক্যাল কলেজের ড্যাবের বর্তমান কমিটির নেতৃবৃন্দ নীরবে সংগঠনকে গোছানোর পাশাপাশি পেশাগত কাজ করছেন। তবে ড্যাবের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য হিসেবে পরিচিত ডা. মুহম্মদ ইসহাক ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালে যোগদানের পর থেকে সমস্যা শুরু হয়েছে। বিশেষ করে তিনি গত বছরের ১০ ডিসেম্বর বদলি হয়ে হাসপাতালে যোগদানের দিন কয়েকশ বহিরাগত সঙ্গে নিয়ে এসে শোডাউন করার বিষয়টি চিকিৎসকসমাজ ভালোভাবে মেনে নেয়নি। ডা. ইসহাক স্থানীয় হওয়ায় সব সময় তার সঙ্গে বহিরাগতদের দেখা যায়। অথচ স্থানীয় ড্যাবের নেতৃবৃন্দকে তার সঙ্গে খুব একটা দেখা যায় না।
ড্যাবপন্থি এক চিকিৎসক নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, ডা. ইসহাক এসেই নানা তদবিরে ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন। বিশেষ করে মেডিক্যাল কলেজের সাবেক সচিব জহুরল হককে ২০২০ সালে অসদাচরণের জন্য বদলি করে কুয়েত বাংলাদেশ মৈত্রী হাসপাতালে পাঠানো হয়। স্বাস্থ্য অধিদফতর থেকে বদলির অর্ডার নিয়ে আবারও সচিব পদে জহুরল হক ময়মনসিংহ মেডিক্যালে যোগদানের চেষ্টা করেন এবং যোগদানের জন্য কলেজের অধ্যক্ষের কাছে ডা. ইসহাক তদবির করেন। কিন্তু অধ্যক্ষ জহুরুলের যোগদান বিষয়ে তদবির গ্রহণ করেননি।
তিনি আরও জানান, এর আগে বদলি হয়ে যাওয়া নেত্রকোনার মোহনগঞ্জ স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে ফিরে আসা অফিস সহায়ক শামীম হোসেন খান ও ভালুকা থেকে বদলি হয়ে আসা অফিস সহায়ক আল আমিনকে ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে যোগদানের জন্য পরিচালকের কাছে কয়েক দফায় তদবির করেন ডা. ইসহাক। যদিও শামীম খানকে যোগদান করাতে পারলেও আল আমিনকে এখনও যোগদান করাতে পারেনি। এ নিয়ে চিকিৎসক ও কর্মচারীদের মাঝে বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়।
অপর এক চিকিৎসক নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, ডা. ইসহাক এসেই একটি গ্রুপ সৃষ্টি করেছেন। তার গ্রুপের সদস্যরা ড্যাবের সিনিয়র সদস্য কিংবা চিকিৎসকদের সঙ্গে প্রায়ই অসদাচরণ করে থাকেন। এ নিয়েও চিকিৎসকসমাজের মাঝে ক্ষোভ রয়েছে। এসব ঘটনায় ড্যাবের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হচ্ছে এবং নিজেদের মধ্যে দ্বন্দ্ব দিনদিন ঘনীভূত হচ্ছে। দ্রুত নিজেদের মাঝে দ্বন্দ্ব মেটাতে না পারলে ভবিষ্যতে আরও তীব্র আকার ধারণ করবে জানান তিনি।
এ বিষয়ে ড্যাবের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ডা. মুহাম্মদ ইসহাক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমাদের দলীয় লোকজন তদবির করেছিলাম। তবে যোগদানের বিষয়টি সম্পূর্ণ কর্তৃপক্ষের এখতিয়ার।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমি ময়মনসিংহের স্থানীয় বাসিন্দা। দীর্ঘদিন আওয়ামী লীগ সরকারের রোষানলে পড়ে বাইরে কাটাতে হয়েছে। হাসপাতালে যোগদানের দিন আমার কিছু আত্মীয়স্বজন এবং বন্ধুবান্ধব আমার সঙ্গে এসেছিল। এরপর থেকে তারা আর আমার সঙ্গে আসে না। আমি আমার সাথি ড্যাবের চিকিৎসকদের নিয়ে চলাফেরা করি। আমি এখানে নেতৃত্ব দিই এটা অনেকেই মেনে নিতে পারছে না। এটা তাদের সমস্যা, আমার কোন সমস্যা না। তবে আমি ড্যাবের একজন নিবেদিত কর্মী হিসেবে সংগঠনের জন্য কাজ করে যাচ্ছি।’
ড্যাবের ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ শাখার সভাপতি ডা. বদর উদ্দীন বলেন, ‘বর্তমানে আমরা সংগঠনকে গোছানোর পাশাপাশি পেশাগত দায়িত্ব যথাযথভাবেই পালন করছি। আমরা কলেজ ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে নানাভাবে সহায়তা করছি। কলেজ ও হাসপাতাল ক্যাম্পাসে বহিরাগতদের নিয়ে শক্তি প্রদর্শন না করাটাই ভালো বলে মনে করি।’
ড্যাব ময়মনসিংহ জেলা শাখার সভাপতি ডা. ওয়ালী উল্লাহ বলেন, ‘ডা. মুহম্মদ ইসহাক ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে যোগদানের পর থেকেই নানা সমস্যার কথা আমাদের কানে আসতেছে। তার কারণে ড্যাবের চিকিৎসকসমাজে গ্রুপিং তৈরি হচ্ছে এটা কাম্য না। ডা. ইসহাক মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে বহিরাগতদের নিয়ে এসে কর্তৃপক্ষের কাছে নানা তদবির করছেন এটাও আমরা শুনতে পেয়েছি। আমাদের চিকিৎসকসমাজের যে কাজ সেই দিকেই মনোযোগী হওয়াটা জরুরি।’ এখন সংগঠন গোছানোর সময়, দ্বন্দ্ব সৃষ্টি করার সময় না বলেও জানান তিনি।
ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর ডা. নাজমুল হাসান খান বলেন, ‘আমার কাছে এসে অনেকেই তদবির করেন। তবে কোনও অনৈতিক তদবির আমি গ্রহণ করি না। যতক্ষণ চেয়ারে আছি সরকারের দেওয়া দায়িত্ব পালন করে যাবো। তবে কোনও চিকিৎসক নেতা কিংবা অন্য কেউ যাতে অনৈতিক তদবির না করেন এ ব্যাপারে সবার সহযোগিতা প্রয়োজন।’