আজ ৩ এপ্রিল। আলমগীরের জন্মদিন। না, মুঘল সম্রাট আলমগীর নন, তিনি নায়ক আলমগীর। অবশ্য এক অর্থে তিনিও সম্রাট। বাংলা চলচ্চিত্রের সম্রাট! জন্মদিনের শুভক্ষণে ফোন করি তাঁকে। একবার রিং বাজতেই রিসিভ করেন তিনি। সেই চিরপরিচিত ভরাট কণ্ঠ।
—হ্যালো!
—শুভ জন্মদিন!
—অনেক ধন্যবাদ। কেমন আছো?’ ফোনের অপর প্রান্তে তাঁর হাসি টের পাওয়া যায়।
—জি ভালো আছি। ৭৫ পেরোলেন আজ। কেমন লাগছে?
—৭৫ হয়ে গেছে আমার? বলো কি!
—জি
—ভালো লাগছে। ভালোই তো একটা দীর্ঘ জীবন পেলাম।
—জন্মদিন নিয়ে বিশেষ কোনো উচ্ছ্বাস কাজ করে?
—আমি তো এখনো সতেজ ও সুস্থ আছি। সুতরাং, কিছুটা ভালো লাগা তো কাজ করেই। তবে জন্মদিনে বিশেষ কোনো উৎসব নেই। ঘরোয়াভাবে কাটছে আজকের দিন। বাইরের কেউ আসবে না। হয়তো আজকে ছেলেমেয়েরা আসবে। তারা নিশ্চয়ই একটা কেক কাটবে। আমার এক মেয়ে দেশের বাইরে থাকে। ঈদ করতে ঢাকায় এসেছে। তার মেয়েরও জন্মদিন ১২ এপ্রিল। নানা–নাতি মিলে কেক কাটব। এই তো!
—এর বাইরে আর কিছু না?
—নাহ, আর কী? কত জন্মদিন তো চলে গেছে ব্যস্ততার ফাঁকে, টেরই পাইনি!
—জন্মদিন নিয়ে বিশেষ কোনো স্মৃতি মনে পড়ে?
—স্মৃতির কি আর শেষ আছে? তবে ছোটবেলায় ঘটা করে জন্মদিন পালন হতো। অনেক বন্ধুবান্ধব, আত্মীয়স্বজন আসত। এখন আর ওসব করি না। ঘরোয়াভাবে পরিবারের সঙ্গে কাটাই।…
সংক্ষিপ্ত কথোপকথন শেষ হলো। মনে পড়ে গেল গত বছর তাঁর জন্মদিনের ঠিক আগে বাসার ড্রয়িং রুমে বসে দীর্ঘ আলাপ হয়েছিল তাঁর সঙ্গে। সেই এপ্রিলে চরম গরম ছিল। তীব্র তাপে পুড়ছিল চারপাশ। নির্দিষ্ট সময়ের আধা ঘণ্টা আগে পৌঁছে পায়চারি করছিলাম বাসার নিচে। খোঁজ পেয়ে তিনি ডেকে পাঠান। ঘরে ঢুকতেই গম্ভীর মুখ জিজ্ঞাসা—নিচে হাঁটাহাঁটি করছ কেন?
—না মানে আমার তো আরও আধা ঘণ্টা পরে আসার কথা। তাই সময় কাটানোর জন্য নিচে অপেক্ষা করছিলাম।
গাম্ভীর্যের মুখোশ খুলে এবার হাহা করে হাসেন তিনি।
—ভারি অদ্ভূত ছেলে তো তুমি? বলো কী জানতে চাও?
—জানতে চাই না তেমন কিছু। আপনার সঙ্গে কিছুক্ষণ আড্ডা দিতে চাই।
কথা শুনে একটু থামেন তিনি। তীক্ষ্ণ চোখে তাকিয়ে থাকেন দেয়ালে টাঙানো নিজের একটা ছবির দিকে। সুন্দর গোছানো বিশাল ড্রয়িং রুমে দেয়ালে দেয়ালে আলমগীরের তারুণ্যের ছবি। এক পাশের দেয়ালজুড়ে কাঠের কারুকাজ করা হারমোনিয়াম, তানপুরা ও ফিল্মি ক্যামেরার ভাস্কর্য। ভাস্কর্যটি দেখে বোঝা যায় রুনা লায়লা আলমগীরের যুগলবন্দী জীবনকে ইঙ্গিত করছে এই কারুকাজ। তার নিচে থরে থরে সাজানো নানা পুরস্কার। তার মধ্যে অনেকগুলো জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারের পদক। দেয়াল থেকে চোখ ফিরিয়ে প্রশ্ন করি আলমগীরকে।
—পাঁচ দশকের বেশি সময়ের চলচ্চিত্রযাত্রায় পেছন ফিরলে অর্জনের খাতায় কী দেখেন?
ছোট করে একটুখানি হাসেন তিনি। বলেন, ‘অর্জন কী আছে? অর্জন তো কিছু নেই! যেটা স্বপ্ন দেখে, তার আশপাশে তো যেতে পারে না মানুষ। আমরা যখন যাত্রা শুরু করি, তখন চলচ্চিত্রের উড়ব উড়ব ভাব। তারপর আমরা যখন মধ্য গগণে, তখন চলচ্চিত্র উড়ছিল। কিন্তু এখন তো চলচ্চিত্র ভালো নেই। ভালো আছি কী করে বলব।’
—কোনো গ্রাফ তো আর সরল রেখায় চলে না। আপ অ্যান্ড ডাউন থাকে। এখন হয়তো একটু ডাউন। আবার চলচ্চিত্রের ওপরে ওঠার সম্ভাবনা কতটুকু দেখেন আপনি?
—আমি আশাবাদী লোক। এখন রাত চলছে। ভোর হবে আবার। সে আশা করি। কিন্তু একটু ভয় লাগে। আমরা সবাই মিলে হয়তো চেষ্টা করছি। কিন্তু মুষ্টিমেয় কয়েকজন শিল্পী, কলাকুশলী, প্রযোজক ও পরিচালক মিলে কী করবে। আমাদের সিঙ্গেল স্ক্রিন সিনেমা হল লাগবে। মাল্টিপ্লেক্স তো একটা সিনেমা ইন্ডাস্ট্রির পরিচয় হতে পারে না!
—আপনি বলেছিলেন মানুষ এক জীবনে স্বপ্ন ছুঁতে পারে না। কিন্তু স্বপ্ন তাড়া করে….
—হ্যাঁ, তাড়া তো আমি করেছি। এখনো করে চলেছি। দীলিপ কুমারের সঙ্গে আমার দেখা হয়েছে অনেকবার। তিনি আমাকে বলেছেন, আলমগীর আমি অ্যাকটিংয়ের Aটাও এখনো শিখতে পারিনি। দীলিপ কুমার যদি এ কথা বলেন, তাহলে ভাব আমাদের অবস্থা কোথায়? অভিনয়ের যে বিশালতা, সেটা এক জনমে খুঁজে বের করা সম্ভব নয়। অভিনেতা হিসেবে নিজেকে খুব বেশি নম্বর দিতে পারি না। দুই–তিন নম্বর হয়তো দেব, দশের মধ্যে।
—এই যে আপনি অভিনেতা হিসেবে নিজেকে দুই–তিন নম্বর দিচ্ছেন, আপনি দীলিপ কুমারের কথা বলছেন, এই যে একটা অতৃপ্তি, স্বপ্ন তাড়া করতে এই অতৃপ্তিই কি একজন শিল্পীকে এগিয়ে নেয়?
—হ্যাঁ, তাই হয়েছে গত পঞ্চাশ বছর ধরে। ধরো, একটা শট দিয়ে এলাম। পরে এসে ভাবছি, এটা এভাবে না করে ওভাবেও করতে পারতাম। এই যে ভাবনা, আমার কিন্তু রাতের ঘুম হারাম হয়ে গেল।
অভিনেতা আলমগীর; ছবি: সংগৃহীত
—আপনার নায়িকাদের নিয়ে বলুন। আপনার সময়ের সব নায়িকার সঙ্গে কাজ করেছেন। তবে শাবানা–আলমগীর জুটি এখনো মানুষের মুখে মুখে ফেরে। দর্শক জুটি তৈরি করে নাকি পরিচালক তৈরি করেন, নাকি গল্পের প্রয়োজনেই হয়?
—আসলে এটা কেউ তৈরি করে না। এটা হয়ে যায়। আমি আর শাবানা প্ল্যান করে কোনো সিনেমা করিনি। আমার প্রথম সিনেমা রিলিজ হয় ১৯৭৩ সালে। আমি শুটিং শুরু করেছি ’৭২-এর ২৬ জুন। প্রথম সিনেমা রিলিজের আগে আরও চার–পাঁচটা সিনেমা হয়ে যায় আমার। শাবানার সঙ্গে আমার প্রথম সিনেমা ‘দস্যুরানী’ এরপর ‘অতিথি’, ‘জয় পরাজয়’। তিনটাই সুপার হিট হয়েছিল। পরিচালকেরা তো গল্প অনুযায়ী নায়ক–নায়িকা নেন। কিন্তু প্রডিউসারেরা চান সেলেবল কমোডিটি। তখন প্রডিউসারেরা বলতে থাকলেন, এমন গল্প নেন যেখানে আলমগীর-শাবানাকে নেওয়া যায়। আমাদের সময় আমরা সবাই কাজপাগল ছিলাম। প্রেমটেম করার সময় ছিল না আমাদের। এর ওপর পরিচালকদের চোখ, মারাত্মক চোখ। আমি ডায়লগ বাদ দিয়ে হিরোইনের সঙ্গে কথা বলছি, বকা শুনতে হতো, খুব বকা শুনতে হতো। শাবানা, কবরী ও ববিতা মানুষ হিসেবে অসাধারণ, শিল্পী হিসেবেও অসাধারণ। আসলে তাঁদের সম্পর্কে মন্তব্য করা আমার সাজে না। কারণ, তাঁরা তিনজনই নায়িকা হিসেবে আমার সিনিয়র। হ্যাঁ, রোজিনা সম্পর্কে বলতে পারি। রোজিনা একটা কাজপাগলা মেয়ে ছিল। ও আর কিছু বুঝত না। সিনেমা করতে হবে, ভালো অভিনয় করতে হবে…ও জীবন দিয়ে কাজ করত। শাবানাও প্রচণ্ড সিরিয়াস অভিনেত্রী। ববিতাও মোটামুটি সিরিয়াস অভিনেত্রী…হাহাহা
—মোটামুটি সিরিয়াস কেন?
—ফূর্তিবাজ ছিলেন। হুল্লোড় করতেন। উনি আমাদের খুব স্নেহ করতেন। আর ববিতাকে চেনা কিন্তু খুব কঠিন। ববিতার সামনে সব সময় একটা পর্দা থাকে। পর্দা ক্রস করতে পারলে সে খুব ভালো বন্ধু। তবে পর্দা ক্রস করার পারমিশন পাওয়া খুব কঠিন। কিন্তু তাঁদের অভিনয় যাচাই করার মতো ক্ষমতা আমার নেই।
গল্পে গল্পে কেটে যায় অনেক সময়। জিজ্ঞেস করি, অন্তরালের জীবনে থাকতে সুচিত্রা সেন হাতে গোনা যে কয়েকজন মানুষকে দেখা দিতেন, তাঁদের মধ্যে আপনিও ছিলেন, কীভাবে?
অভিনেতা আলমগীর। ছবি: সংগৃহীত
—সময়টা ঠিক মনে নেই। আমি কলকাতায় সিনেমা করতে যাই। ঢাকার আরও কয়েকজন আর্টিস্ট ছিলেন। শুটিংয়ের আগে আমি স্টুডিও দেখতে গেলাম। একটা মেকাপ রুম ছিল, যেটা উত্তম কুমার ব্যবহার করতেন। ঘুরে ঘুরে দেখলাম। এমন সময় মনে হলো, সুচিত্রা সেন তো বেঁচে আছেন। উত্তম কুমারের সঙ্গে দেখা হলো না, সুচিত্রা সেনের সঙ্গে তো দেখা করার চেষ্টা করতে পারি। একপ্রকার যুদ্ধ করে তাঁর সঙ্গে দেখা করেছি। অনেককে বলেছি, সুচিত্রা সেনের সঙ্গে দেখা চাই। সবার এক কথা, যা চাও করে দেব, কিন্তু এটা সম্ভব না। বারীন ব্যানার্জি নামের আমার এক বন্ধু তাঁর গাড়ি করে সুচিত্রা সেনের বাড়ির গেটে পৌঁছে দিলেন। দারোয়ানকে দিয়ে আমার কার্ড পাঠালাম। পেছনে লিখে দিলাম—দিদি আমি বাংলাদেশ থেকে আলমগীর। তোমার দর্শন প্রার্থনীয়। কিছুক্ষণ পর দারোয়ান একটা কাগজে ফোন নম্বর লিখে নিয়ে এল। পরদিন সকাল ১০টায় কল করতে বলেছেন। পরদিন কল করলাম। কথা হলো। কিন্তু তিনি দেখা দেবেন না। জোরাজুরি করতে থাকলে তিনি বললেন, পরের বার এলে দেখা হবে। আমি বললাম, দিদি উত্তর কুমারও আমাকে বলেছিলেন পরেরবার এলে দেখা হবে। কিন্তু দেখাটা আর হয়নি। তখন কাজ হলো। তিনি আমাকে সময় দিতে রাজি হলেন। তবে বললেন, এসো, সময় পনেরো মিনিট। বাট নো ফ্রেন্ডস, নো ক্যামেরা। সেই পনেরো মিনিট হয়ে গেল এক ঘণ্টা। তারপর তো আমি তার ছোট ভাই হয়ে গিয়েছিলাম।
আলমগীরের সঙ্গে আড্ডায় সময়টা যেন পাগলা ঘোড়ার মতো ছুটছে। তবু কথা শেষ হয় না। কিন্তু একসময় তো থামতে হয়। আমিও থামি।
বাইরে বের হয়ে রাস্তায় নামি। তাতানো রোদ কমে গিয়ে রাস্তাজুড়ে বিছিয়ে কমলা রঙের আলো। বইছে আরামদায়ক বাতাস।